পেটের আবার জাত কীসের! নন্দীগ্রামে ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে ‘সেবাশ্রয়’-এর জনজোয়ার
ভোট-রাজনীতির তীব্র দাবদাহ শুরু হওয়ার আগেই নন্দীগ্রাম যেন বলছে একেবারে অন্য কথা। বাইরে ভেদাভেদের রাজনীতি থাকলেও, পূর্ব মেদিনীপুরের এই ‘হটসিট’-এ আপাতত প্রধান পরিচয়—মানুষের প্রয়োজন, আর সেই প্রয়োজন মেটানোর ঠিকানা হয়ে উঠেছে ‘সেবাশ্রয়’। সরেজমিনে নন্দীগ্রামে পা রাখলেই চোখে পড়ছে এক অন্য আবহ, যেখানে রাজনীতির বদলে মুখ্য হয়ে উঠেছে চিকিৎসা আর স্বস্তির নিঃশ্বাস।
খোদামবাড়ি হোক কিংবা নন্দীগ্রাম বাইপাস—দুই সেবাশ্রয় ক্যাম্পেই উপচে পড়ছে মানুষের ভিড়। এক ঝলকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এটা নন্দীগ্রাম না ডায়মন্ড হারবার! তথাকথিত শুভেন্দু-গড় নন্দীগ্রামে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে অন্য সুর, অন্য বাতাস। অনেকের কথায়, “মেলালেন তিনি, মেলালেন”—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রাজনীতির বিভাজন ছাপিয়ে এক ছাতার তলায় আসছেন সাধারণ মানুষ।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে নজির সৃষ্টি করেছে এই স্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ। এক ক্যাম্পেই মিলছে প্রায় সব রকম পরিষেবা—জেনারেল মেডিসিন থেকে অস্থিরোগ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, চোখের চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রয়েছে মিনি আইসিইউ, চোখের অস্ত্রোপচার, এমনকি প্রয়োজনে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও। এক কথায়, ছোটখাটো বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে নন্দীগ্রামের এই দুই সেবাশ্রয় ক্যাম্প।
পরিসংখ্যান বলছে, ২৪ জানুয়ারি রাত ৮টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামের দুই সেবাশ্রয় ক্যাম্পে এসেছেন ২৫ হাজারের বেশি মানুষ। প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজারেরও বেশি রোগী দেখছেন চিকিৎসকেরা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রত্যেকটি বিভাগেই সমস্ত পরিষেবা মিলছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। নন্দীগ্রামের আনাচ-কানাচ তো বটেই, পটাশপুর-সহ আশপাশের এলাকা থেকেও ছুটে আসছেন মানুষ। কারও কিডনির সমস্যা, কারও চোখে ছানি, আবার কেউ হৃদরোগে ভুগছেন—সব ক্ষেত্রেই মিলছে নির্দিষ্ট চিকিৎসা।
নন্দীগ্রামের খোদামবাড়ি এলাকার সেবাশ্রয় ২ মডেল ক্যাম্পের চিকিৎসক কো-অর্ডিনেটর বিশ্বজিৎ সাহু জানান,
“মাননীয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ১৫ জানুয়ারি থেকে এই ক্যাম্প শুরু হয়েছে। চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী আসছেন। বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নন্দীগ্রামের মানুষ ভীষণ খুশি।”
সেবাশ্রয়ে আসা সাধারণ মানুষের মুখেও একই সুর। কানের সমস্যায় দীর্ঘদিন ভোগা রুথরেজা বিবির কথায়,
“বিনা পয়সায় এত ভালো চিকিৎসা পেয়েছি। এখন অনেকটাই ভালো আছি। আবার যেন এমন ক্যাম্প হয়।”
শেফালি মিত্র ও আরতি রানি মান্না বলছেন,
“এমন উদ্যোগ আগে কখনও দেখিনি। নন্দীগ্রামে এমন স্বাস্থ্যশিবির হবে, ভাবতেই ভালো লাগছে। এর কোনও তুলনা নেই।”
গত পাঁচ বছরে রাজনীতি, অশান্তি আর নানা টানাপোড়েন দেখেছে নন্দীগ্রাম। ঠিক সেই পটভূমিতেই রবিবারের নন্দীগ্রাম যেন বলছে, এখানে এখন রাজনীতির থেকেও বড় হয়ে উঠেছে মানুষের প্রয়োজন। অনেকের মতে, আগামী দিনে পথ দেখাবে নন্দীগ্রাম নয়—পথের কথা বলবে এই ‘সেবাশ্রয়’।