শীতের দাপট ফের স্পষ্ট বাংলায়: আগামী সাত দিনের বিস্তারিত আবহাওয়া পূর্বাভাস
শীতের আমেজ আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গে। ভোরের দিকে ঘন কুয়াশা, উত্তুরে হাওয়ার দাপট এবং ক্রমশ নামতে থাকা পারদের জেরে রাজ্যজুড়ে আবহাওয়ার চরিত্রে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে শীত যে আরও কিছুটা জাঁকিয়ে বসতে চলেছে, সে ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিল আলিপুর আবহাওয়া দফতর। সাম্প্রতিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতি সেই পূর্বাভাসকেই আরও জোরালো করছে।
ঘূর্ণাবর্ত ও পশ্চিমী ঝঞ্ঝার যুগল প্রভাব
আবহাওয়া দফতরের মতে, এই মুহূর্তে একাধিক বৃহৎ আবহাওয়াগত ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে পূর্ব ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে। দক্ষিণ বাংলাদেশ ও সংলগ্ন এলাকায় একটি আপার এয়ার সার্কুলেশন বা ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় রয়েছে। এর পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার উপকূল সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকাতেও আরেকটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে। এই দুটি ঘূর্ণাবর্ত মূলত আর্দ্রতা বহন করলেও, উত্তুরে হাওয়ার প্রবাহের কারণে সেই আর্দ্রতা রাজ্যে বৃষ্টি ঘটানোর মতো সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারছে না।
অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম ভারতে সক্রিয় হচ্ছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা (Western Disturbance)। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব শীঘ্রই আরও একটি নতুন পশ্চিমী ঝঞ্ঝা উত্তর ভারতে প্রবেশ করতে পারে। এই পরিস্থিতির ফলে হিমালয় সংলগ্ন এলাকায় তুষারপাতের সম্ভাবনা বাড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে উত্তর ও পূর্ব ভারতের সমভূমিতে। পশ্চিমবঙ্গেও এর জেরে উত্তুরে হাওয়া আরও শক্তিশালী হবে এবং শীতের দাপট বাড়বে।
কলকাতায় পারদের পতন
এরই মধ্যে কলকাতায় ফের নামতে শুরু করেছে তাপমাত্রা। শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে, যা এই সময়ের স্বাভাবিক মানের কাছাকাছি হলেও শীতের অনুভূতি বেশ স্পষ্ট। সকালের দিকে উত্তুরে হাওয়া বইতে শুরু করায় ঠান্ডার কামড় আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। ভোরের দিকে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা শহরের বিভিন্ন অংশে দেখা যাচ্ছে, যা যান চলাচলের ক্ষেত্রে সাময়িক অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী অন্তত সাত দিন এই শীতের স্পেল বজায় থাকবে। এই সময়ে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি অথবা সামান্য নীচে থাকতে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া পরিস্থিতি
দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে আগামী কয়েক দিন শীতের আমেজ বজায় থাকবে। পশ্চিমের জেলা যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে রাতের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সব জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে। ফলে ভোর ও রাতের দিকে কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হবে।
উপকূলবর্তী জেলা—পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং উত্তর ২৪ পরগনায়—রাতের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকলেও শীতের অনুভূতি কমবে না। এই সব এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। সকালের দিকে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে নদী ও জলাশয় সংলগ্ন অঞ্চলে।
উত্তরবঙ্গে কুয়াশার দাপট
উত্তরবঙ্গের আবহাওয়ায় কুয়াশার প্রভাব আরও বাড়তে চলেছে। আবহাওয়া দফতরের মতে, আগামী কয়েক দিনে অন্তত চারটি জেলায় কুয়াশার ঘনঘটা দেখা যেতে পারে। দার্জিলিং, কালিম্পং এবং সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় মাঝারি কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা নেমে আসতে পারে প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত। এর ফলে পাহাড়ি রাস্তায় যান চলাচলের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুর জেলাতেও সকালের দিকে কুয়াশার প্রভাব থাকতে পারে। যদিও আপাতত ঘন কুয়াশা নিয়ে কোনও সতর্কতা জারি করা হয়নি, তবুও ভোরের দিকে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।
বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, আবহাওয়া শুষ্ক
একটি স্বস্তির খবর হল, আগামী সাত দিনে রাজ্যজুড়ে বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই বলেই জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় থাকলেও উত্তুরে হাওয়ার প্রভাবে রাজ্যের বায়ুমণ্ডল তুলনামূলকভাবে শুষ্ক থাকবে। ফলে দিনের বেলা আকাশ পরিষ্কার থাকবে এবং রোদের দেখা মিলবে। তবে রাত নামলেই তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি বাড়বে।
আগামী দিনের সামগ্রিক চিত্র
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, আগামী সাত দিন পশ্চিমবঙ্গে শীতের আমেজ জমাট থাকবে। রাত ও দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম থাকবে, তবে বড়সড় কোনও তাপমাত্রা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। দিনে দিনে পারদের ওঠানামা এক ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
সকালে হালকা কুয়াশা বা ধোঁয়াশা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে যাবে। শীতপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি না হলেও, উত্তুরে হাওয়ার কারণে শীতের অনুভূতি স্পষ্টভাবেই বজায় থাকবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ভোর ও রাতের ঠান্ডা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
সব মিলিয়ে, শীতপ্রেমীদের জন্য আগামী সপ্তাহ সুখবর নিয়ে এলেও, কুয়াশা ও ঠান্ডাজনিত সমস্যার কথা মাথায় রেখে সাধারণ মানুষকে সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিচ্ছে আবহাওয়া দফতর।