ব্যুরো রিপোর্ট: দুর্গা পুজোর (DurgaPuja2025) আনন্দের মাঝেই এবং দীপাবলির আগে বড়সড় সুখবর এল কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য। কেন্দ্র সরকার ঘোষণা করেছে যে তারা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া শর্তে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের জন্য ভাতা (ডিএ) আরও ৩ শতাংশ বাড়াচ্ছে।
কিন্তু এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য সরকারি কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কেন্দ্রের ইশতেহারে কেন্দ্রীয় কর্মীদের আর্থিক সুফল বেড়েছে—ফলত: কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে মোট ডিএ পার্থক্য বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ-এ পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
সংগ্ৰামী যৌথ মঞ্চের হুঁশিয়ারি:
সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের নেতা ভাস্কর ঘোষ (Bhaskar Ghosh) বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের মতো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাজ্যও সাধারণত তাদের কর্মীদের বঞ্চিত করে না। কিন্তু কেন্দ্রের ৩ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির ফলে আমাদের কর্মীদের সঙ্গে বৈষম্য ৪০ শতাংশে পৌঁছে গেছে—এটি মেনে নেওয়া যাবে না। পুজোর পর যদি মহার্ঘ্য ভাতা না দেওয়া হয়, তাহলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।"
ভাস্করের এই মন্তব্যের পর রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও সরব হয়েছেন; তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্টে কেন্দ্র-রাজ্য ডিএয়ের পার্থক্য তুলে ধরে তীব্র সমালোচনা জানিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ঘোষণাটি সরাসরি রাজ্যের সরকারি কর্মী-শ্রেণীর ভাবাবেগ ও ভোটবাজারকে স্পর্শ করবে।
আরও জটিলতা হচ্ছে—সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে ডিএ মামলার শুনানি। ২০২২ সালে কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়েছিল যে 'মহার্ঘ ভাতা' সরকারি কর্মীদের একটি মৌলিক অধিকার এবং সেই হারে কেন্দ্রীয় ডিএ রাজ্যকে দিতে হবে; রাজ্য তা চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ আদালতে গেলে শীর্ষ আদালত তখন অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল।
নীচে মামলার বর্তমান অবস্থা ও প্রভাবের সারমর্ম:
- আইনি প্রসঙ্গ: সুপ্রিম কোর্টে মামলার 'সওয়াল' পর্ব শেষ—এখন রায়দানের অপেক্ষা রয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, রায় রাজ্য ও কেন্দ্র—উভয়েরই বাজেটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
- রাজনৈতিক প্রভাব: আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই ইস্যু রাজনৈতিক তেল যোগাবে; বিরোধীরা রাজ্যের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
- সামাজিক প্রভাব: কর্মীরা যদি বৃহৎ আন্দোলনে যান, তবে সরকারি সেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; পুজোর পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
"ওই মামলায় আমরা জিতব—কারণ এটি অধিকারের প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়ার বিষয়েও আমরা আশাবাদী। যদি না হয়, তো ভোটের সময় পর্যন্ত বড় আন্দোলন করা হবে" — ভাস্কর ঘোষ।
নবান্নের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে—বকেয়া ডিএ নির্ধারণে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ঠিক কতটা পরিশোধ করতে হবে তা নির্ণয়ে সময় লাগছে। রাজ্যের যুক্তি হচ্ছে, হিসাবটি সঠিকভাবে না করেই দেয়া হলে বাজেটগত অটলতা তৈরি হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন স্পষ্ট—"রাজ্যের বাইরে কর্মরত পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মীরা যদি কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পান, তবে বাংলার কর্মীরা কেন বঞ্চিত হবেন?"
অর্থনীতিবিদরা মন্তব্য করেন, কেন্দ্রীয় হারে দৈনিক ভাতা মানে রাজ্যকে আর্থিক বোঝা বহন করতে হবে; রাজ্য যদি তা স্বেচ্ছায় গ্রহণ না করে, তাহলে আইনি লড়াই ও সামাজিক অনড়তা দুইই বাড়বে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে কর্মী সংখ্যাও বড়—তাই বকেয়া অর্থবর্ষিক হিসাব বড় সংখ্যা গড়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও জানাচ্ছেন, যদি সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের পক্ষে রায় দেয় এবং কেন্দ্রীয় হারে বকেয়া পরিশোধ আদেশ করে, তাহলে রাজ্যকে বিভিন্ন ব্যাজেট পুনর্বিন্যাস করতে হবে—যা সামাজিক ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, যদি রাজ্য হারায়, ভবিষ্যতে একই ধরনের দাবির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হারের ভিত্তিতে অংশ দান না করায় কর্মীরা বারবার আন্দোলনে যেতে পারে।
এখনকার পরিস্থিতিতে সব পক্ষই পুজোর মেনে চলা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে কথা বলছে—তবে মাঠ পর্যায়ের সংগঠিত কর্মী শক্তি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এই ইস্যুকে কেবল আইনি পর্যায়ে আটকে রাখতে দেবে না, এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই প্রতিবেদন আপডেট করা হবে—যদি সুপ্রিম কোর্টের রায় বা রাজ্য/কেন্দ্রের পক্ষ থেকে নতুন ঘোষণা আসে।