নেপালের অশান্তি ঘিরে প্রতিবাদের আগুন: মানীষা কৈরালার বক্তব্য, কেপি শর্মা ওলির পতন এবং রাজনৈতিক সংকট
Y বাংলা ব্যুরো: প্রতিবেশী দেশ নেপাল বর্তমানে তীব্র অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন এবং সমাজমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে শুরু করে বিরগঞ্জ, ভৈরহাওয়া, বুটওয়াল, পোখরা, ইটাহারি এবং দামাক পর্যন্ত। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বলিউডের খ্যাতনামা অভিনেত্রী মানীষা কৈরালা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। পাশাপাশি, রাজনৈতিক চাপের মুখে কেপি শর্মা ওলি শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
মানীষা কৈরালার তীব্র প্রতিক্রিয়া: ‘নেপালের জন্য কালো দিন’
নেপালের চলমান বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে অন্তত ২০ জন নিহত এবং আড়াইশোর বেশি মানুষ আহত হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিন্দার ঝড় তুলেছেন বলিউড তারকা মানীষা কৈরালা। তিনি লিখেছেন, “আজ নেপালের কালো দিন। যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ন্যায়ের দাবির উত্তর দেওয়া হয় গুলি দিয়ে, তখন তা দেশবাসীর জন্য এক অন্ধকার অধ্যায়।”
নিজের পোস্টে তিনি একটি রক্তমাখা জুতোর ছবি শেয়ার করেন, যা আন্দোলনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, “দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কণ্ঠস্বর দমন করতে রক্তপাত কোনও দিনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।” তাঁর এই পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়েছে এবং সমর্থনের পাশাপাশি নেপালের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বহু নেটিজেন।
জেন জি নেতৃত্বে আন্দোলনের বিস্তার
রবিবার থেকেই শুরু হয় জেন জি প্রজন্মের নেতৃত্বে বিক্ষোভ। প্রথমে অনলাইনে শুরু হলেও, সোমবার তা রূপ নেয় তীব্র সংঘর্ষে। পার্লামেন্ট চত্বরে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী সমবেত হন। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনা নামানো হয় রাজধানীতে।
বিক্ষোভের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বাইরেও। বিরগঞ্জ, ভৈরহাওয়া, বুটওয়াল, পোখরা, ইটাহারি ও দামাকে কার্ফু জারি করা হয়। এই পরিস্থিতির জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাজার, পরিবহন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে যায়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: পদত্যাগের ঢেউ
জনরোষের মুখে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। এরপর মঙ্গলবার সকালে রাজনৈতিক চাপ আরও তীব্র হলে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তাঁর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগ, সমাজমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা এবং জনতার প্রতিবাদের মুখে তাঁর শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার পর একের পর এক মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। বিরোধী দলও তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। যদিও মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সর্বদল বৈঠকের ডাক দিয়েছিলেন ওলি, তবুও তাঁর সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয় যে তিনি শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের মতো দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন।
সমাজমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা: আন্দোলনের অনুঘটক
নেপালের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হল সমাজমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা। অনলাইনে মতপ্রকাশ বন্ধ হওয়ায় যুবসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তাঁদের সমর্থন দিতে না পারার হতাশা বিক্ষোভে পরিণত হয়। মূলত এই নিষেধাজ্ঞাই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হলে জনতার মধ্যে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। নেপালের ঘটনাও তার বড় উদাহরণ।
মানবিক সংকট: আহত, মৃত এবং আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ
সরকারি সূত্র অনুযায়ী পুলিশের গুলিতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা আড়াইশোর বেশি। হাসপাতালে জায়গার অভাব এবং চিকিৎসা পরিষেবার চাপ বাড়ছে। বাজার বন্ধ, পরিবহন ব্যাহত এবং কার্ফুর ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেন না। পর্যটন শিল্পও ধাক্কা খেয়েছে। কাঠমান্ডু থেকে বাস পরিষেবা স্থগিত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবেশী দেশের উদ্বেগ
নেপালের পরিস্থিতি ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলির জন্যও উদ্বেগজনক। সীমান্তবর্তী শহরগুলিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে। ভারত-নেপাল সীমান্তে আটকে আছে হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক। ওষুধ, খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সীমান্ত পারাপারে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিশ্ব সম্প্রদায় এই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি দ্রুত শান্তি ও সহানুভূতির আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সমাজমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি: স্থিতিশীলতা কি ফিরে আসবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পুনর্গঠন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ছাড়া পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ফিরে আসা কঠিন। জেন জি আন্দোলনের এই জোয়ার দেখিয়েছে তরুণ প্রজন্ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পায় না। তবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
মানীষা কৈরালার মতো জনমান্য ব্যক্তিদের প্রতিবাদ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি যোগাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য সামাজিক আলোচনাকে নতুন গতি দিয়েছে। তবুও মাঠের বাস্তবতা এখনো কঠিন। আহতদের চিকিৎসা, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা সমাধান করাই হবে আগামী দিনের বড় লক্ষ্য।
নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি যথাযথ মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সমর্থন প্রদান করে, তবে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি এবং প্রতিনিয়ত আপডেট প্রদান করবো।
📢 সবার আগে নিউজ আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন
📰 রাজনীতি | ⚽ খেলা | 🎬 বিনোদন | 🌍 আন্তর্জাতিক খবর 👉 সবকিছু এক ক্লিকেই পান আপনার হাতে।
👍 ফলো করুন Facebook 💬 Join করুন WhatsApp গ্রুপে





















