‘কাউকে কি এভাবে বলতে পারেন বাংলাদেশি?’ – কলকাতা হাইকোর্টের তীব্র প্রশ্ন কেন্দ্রের উদ্দেশে
Y বাংলা ডেস্ক: নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্ক, মানবাধিকার এবং আইনের লঙ্ঘন – এই তিনের কেন্দ্রে উঠে এল দিল্লির ঘটনাটি। কাজের উদ্দেশ্যে পরিবারসহ দিল্লিতে গিয়েছিলেন বীরভূমের দুই পরিবার। অথচ তাঁদের আটক করে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা হয় এবং মাত্র দু’দিনের মধ্যে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঘটনায় এবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চের শুনানিতে উঠে আসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা দেশের নাগরিকত্ব আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
ঘটনার পটভূমি
বীরভূম জেলার দুই পরিবার কাজের সন্ধানে দিল্লি গিয়েছিলেন। তাঁদের আটকের পরে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা হয়। এন কাটজু মার্গ থানায় আটক রাখার কয়েকদিন পরেই তাঁদের জোর করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে আত্মীয়রা কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন। তাঁরা আদালতের কাছে আবেদন জানান, যেন ওই দুই পরিবারকে ফেরত এনে তাঁদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
বিচারপতির কঠিন প্রশ্ন
শুনানির সময় বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী কেন্দ্রের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, “২৪ জুন অর্ডার হল, আর মাত্র দু’দিনের মধ্যে এদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিলেন? কীভাবে এত তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলেন এরা বাংলাদেশি?” আদালতের বক্তব্য, আইনের ২১ নম্বর ধারায় অন্তত ৩০ দিন আটক রেখে তদন্ত করার কথা বলা হয়েছে। তা না মানা কেন?
বিচারপতি আরও বলেন, “শীর্ষ আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করা হয়েছে। একজন স্পেশাল ইনফর্মারের কথায় ভিত্তি করে কীভাবে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করলেন? কাউকে কি এভাবে বলা যায় ‘বাংলাদেশি’?” এই মন্তব্য কেন্দ্রের আইনজীবীকে কার্যত কোণঠাসা করে।
কেন্দ্রের আইনজীবীর যুক্তি ও আদালতের প্রতিক্রিয়া
কেন্দ্রের আইনজীবী অশোক চক্রবর্তী বলেন, “মামলাটি দিল্লিতে রয়েছে। এরা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য লুকিয়েছে। তাই এই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নেই।” তাঁর সওয়াল শুনে বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আপনি কি মনে করেন যদি এরা কলকাতায় আটক হত, তাহলে শুধু এই আদালত শুনানি করত? বহিষ্কৃত ব্যক্তির কি আর কোনও সমাধান নেই?”
অন্যদিকে আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী বলেন, “এরা আজ পর্যন্ত হলফনামায় বলেননি যে তাঁরা বাংলাদেশি নাগরিক নন।” বিচারপতির পাল্টা মন্তব্য, “অর্ডারে আপনার অফিসার লিখেছেন বাংলাদেশি বস্তি থেকে আনা হয়েছে। তাহলে আপনি কারণ জানাতে বাধ্য। কোথায় ভিত্তি নিয়ে তাঁদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন?”
মানবাধিকার বনাম নিরাপত্তা – আদালতের অবস্থান
আদালত স্পষ্ট জানায়, শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অন্য দেশের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। আইনের বিধান অনুসারে যথাযথ তদন্ত ছাড়া কোনও ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। বিচারপতির বক্তব্য, “নিরাপত্তার প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই মানবাধিকার রক্ষাও সমান জরুরি। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নামে আইনের পথ এড়ানো যায় না।”
এখানে আদালতের অবস্থান পরিষ্কার – সন্দেহভাজন হলেও অন্তত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নাগরিকত্ব যাচাই করতে হবে। অন্যথায় এটি আন্তর্জাতিক আইন এবং ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
ঘটনাটি শুধু আইনি নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকত্ব নিয়ে এই ধরনের তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দেশের রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে। একদিকে নিরাপত্তার যুক্তি, অন্যদিকে মানবাধিকারের প্রশ্ন – দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখাই সরকারের দায়িত্ব। আদালত এই ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্র বলেন, “কাউকে তার পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়ে ফেরত পাঠানো শুধু মানবাধিকার নয়, বিচারব্যবস্থার ওপরও আঘাত।” আদালত মনে করছে, নাগরিকত্ব নিয়ে স্বচ্ছতা না থাকলে প্রশাসনের ওপর বিশ্বাস নষ্ট হয়।
পরবর্তী শুনানি ও সম্ভাব্য নির্দেশ
শুনানির শেষে আদালত মামলার গ্রহণযোগ্যতা সরিয়ে রাখলেও আগামী বৃহস্পতিবার আবার শুনানির দিন ধার্য করেছে। আদালতের পক্ষ থেকে মামলাকারী আইনজীবীকে প্রশ্ন করা হয়েছে, “আপনারা বহিষ্কারের অর্ডার চ্যালেঞ্জ করেননি কেন? না করলে আদালত কী ভিত্তিতে শুনানি করবে?” আদালত চাইছে এই মামলার প্রক্রিয়াগত ও আইনি ভিত্তি পরীক্ষা করতে।
আইনি মহলের মতে, আগামী শুনানিতে আদালত কেন্দ্রের আইনজীবীকে আরও কঠিন প্রশ্ন করতে পারে। একই সঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় নতুন দিশা দেখাতে পারে। মানবাধিকার সংস্থা এবং আইনজীবীরা আদালতের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বক্তব্য শুনতে হবে। আইনের ধারা অনুযায়ী আটক রেখে তদন্ত না করলে তা আইনের অপব্যবহার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি এর আগে বহুবার বলেছে, দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং নাগরিকত্বের নামে তাড়াহুড়ো করা মানবাধিকারের পরিপন্থী। আদালতের এই অবস্থান মানবাধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে।
📢 সবার আগে নিউজ আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন
📰 রাজনীতি | ⚽ খেলা | 🎬 বিনোদন | 🌍 আন্তর্জাতিক খবর 👉 সবকিছু এক ক্লিকেই পান আপনার হাতে।
👍 ফলো করুন Facebook 💬 Join করুন WhatsApp গ্রুপে





















