যাদবপুর-আর জি কর ছাত্রীর রহস্যমৃত্যু: নিস্তব্ধ শহর, সিলেক্টিভ প্রতিবাদ নিয়ে প্রশ্ন
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
স্টাফ রিপোর্টার: শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে একের পর এক ট্র্যাজেডির পরও প্রতিবাদ নেই। নাগরিক সমাজের চোখে এটি প্রতিবাদের বাছাই করা রূপ। সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি অনার্সের ছাত্রী অনামিকা মণ্ডল রহস্যজনকভাবে মারা যান। শোক কাটতে না কাটতেই আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী অনিন্দিতা সোরেনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ পায়। নিহত অনিন্দিতার বাবা-মা খুনের অভিযোগ তোলেন এবং অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মালদহ মেডিক্যালের ছাত্র উজ্জ্বল সোরেনকে। এত বড় ঘটনা, তবুও শহরের রাস্তায় নেই কোনও শোকমিছিল, নেই প্রতিবাদ। নাগরিকরা প্রশ্ন তুলেছেন — প্রতিবাদ কি শুধু নির্বাচিত ঘটনায় হয়?
শহরের রাস্তায় নেই প্রতিবাদ। দুই নামজাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রী মৃত্যুর পরও নিস্তব্ধতা।
নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
শহরের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, প্রতিবাদীরা এখন বেছে বেছে প্রতিবাদ করছেন। তাঁদের কথায়, “প্রতিবাদের নাম করে জনপ্রিয়তা বাড়ানোই যেন আসল উদ্দেশ্য ছিল। কাজ শেষ, স্পিকটি নট!” অনেকে বলছেন, গত বছর আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই এখন সিনেমা প্রমোশন বা ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত। নাগরিক সমাজের একাংশ হতবাক যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটেছে, সেখানে কোনও প্রতিবাদ নেই।
প্রতিবাদীদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন
অভিনেত্রী সোহিনী সরকার এবং অভিনেতা কিঞ্জল নন্দ পুজোর আগে তাঁদের আসন্ন সিনেমার প্রমোশনে ব্যস্ত। অন্যদিকে, প্রাক্তন বাম নেতার কন্যা উষসী চক্রবর্তী সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ত রিল বানাতে। শ্রীলেখা মিত্র নিজের বিয়ের অ্যালবামের ছবি শেয়ার করলেও এই দুই ছাত্রী মৃত্যুর ঘটনায় এক লাইনও লেখেননি। আসফাকুল্লা নাইয়া দুর্গাপুজোর আগে কাশফুলের মাঝে ঘুরে ভিডিও বানাচ্ছেন। এসব দেখে অনেকেই বলছেন, প্রতিবাদ শুধু আলোচনায় আসার মাধ্যম ছিল।
চিকিৎসক সমাজের নিস্তব্ধতা
চিকিৎসক সমাজের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য। ডা. সুবর্ণ গোস্বামী, ডা. নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডা. অনিকেত মাহাতো, ডা. দেবাশিস হালদার সহ বহু চিকিৎসক মুখ বন্ধ রেখেছেন। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে অনিন্দিতার সহপাঠীরা বলেছেন, “ওর জন্য একটি মোমবাতিও জ্বালানো হয়নি। কোনও শোকমিছিল হয়নি। প্রতিবাদের নামে রং দেখে ধিক্কার জানাই। কেন ওর জন্য ন্যায় চাইছে না সমাজ?”
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা
রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণও প্রশ্নের মুখে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নে ক্ষমতায় থাকা বাম ছাত্র সংগঠনের নেতারা ছাত্রীর মৃত্যুর পর নীরব। বাম নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় প্যালেস্টাইন নিয়ে বক্তব্য দিলেও যাদবপুর কিংবা আর জি কর নিয়ে একটিও মন্তব্য করেননি। একইভাবে দীপ্সিতা ধরও এই বিষয়ে নীরব। নাগরিক সমাজের অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলে তাঁরা মুখ বন্ধ রেখেছেন।
প্রতিবাদের রাজনীতি: জনপ্রিয়তা নাকি ন্যায়বিচার?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিবাদের রাজনীতি জনপ্রিয়তা বাড়ানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, প্রতিবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসা। এখন যেখানে কাজ শেষ, সেখানে নীরবতা। নাগরিক সমাজের একাংশের মতে, প্রতিবাদীরা ন্যায়বিচারের দাবির চেয়ে নিজেদের ইমেজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত। এতে শিক্ষার্থীদের মৃত্যু আরও একবার ছায়ায় ঢাকা পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোথায়?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ—এই দুটি নামজাদা প্রতিষ্ঠানেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা স্পষ্ট। নাগরিক সমাজের অনেকে বলছেন, শুধু শোক প্রকাশ করলেই হবে না, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনতে হবে। আন্দোলনের অভাব এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।
আমজনতার হতাশা
শহরের সাধারণ মানুষ হতাশ। তাঁদের মধ্যে অনেকে বলেছেন, “প্রতিবাদ শুধু সেলফির জন্য। আসল উদ্দেশ্য ছিল মিডিয়ায় আসা। এখন কেউ আর এগোচ্ছে না।” এই মন্তব্যে পরিষ্কার যে নাগরিকরা আর প্রতিবাদের ভণ্ডামিতে বিশ্বাস রাখছেন না। তাঁদের দাবি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হোক।
উপসংহার
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী মৃত্যুর ঘটনায় যে নীরবতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি সামাজিক সংকট নয়; এটি আমাদের প্রতিবাদ সংস্কৃতির গভীর রোগের লক্ষণ। জনপ্রিয়তা কেন্দ্রিক প্রতিবাদ, রাজনৈতিক হিসাব, এবং সামাজিক উদাসীনতা—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের দাবি চাপা পড়ছে। নাগরিক সমাজের কাছে এটি এক সতর্কবার্তা—আমরা কাদের জন্য লড়ি, কেন লড়ি, এবং আমাদের প্রতিবাদ আদৌ কতটা অর্থবহ?
📢 সবার আগে নিউজ আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন
📰 রাজনীতি | ⚽ খেলা | 🎬 বিনোদন | 🌍 আন্তর্জাতিক খবর
👉 সবকিছু এক ক্লিকেই পান আপনার হাতে।






















