ধর্মান্তকরণ বিরোধী আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নোটিস: রাজ্যগুলির মতামত চাইল শীর্ষ আদালত
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | Y বাংলা ডিজিটাল ব্যুরো
ছবি: ধর্মান্তকরণ বিরোধী আইন সংক্রান্ত শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টে জনতার উপস্থিতি।
📢 সবার আগে নিউজ আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন
📰 রাজনীতি | ⚽ খেলা | 🎬 বিনোদন | 🌍 আন্তর্জাতিক খবর
👉 সবকিছু এক ক্লিকেই পান আপনার হাতে।
মামলার পটভূমি
ধর্মান্তকরণ বিরোধী আইন নিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। একাধিক জনস্বার্থ মামলার শুনানির পর মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি বিআর গভই এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, ছত্তীসগড়, গুজরাত, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড এবং কর্নাটকসহ মোট নয়টি রাজ্যকে চার সপ্তাহের মধ্যে নিজেদের মতামত জমা দিতে হবে। পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ছয় সপ্তাহ পরে।
মামলাকারীদের অভিযোগ
মামলাকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির এই আইন মূলত আন্তঃধর্মীয় দম্পতিদের হয়রানি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, আইনটির অজুহাতে ভিন্ন ধর্মের দম্পতিদের মিথ্যে অভিযোগে ফাঁসানো হচ্ছে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ব্যাহত হচ্ছে। জামিয়ত উলেমা-এ-হিন্দ এবং সিটিজেনস ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিসসহ একাধিক সংগঠন আদালতে আবেদন জানিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য:
“এই আইনকে হাতিয়ার করে আন্তঃধর্মীয় বিবাহকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ধর্মপালনের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।”
আইনজীবী নিয়োগ ও শুনানির কাঠামো
সুপ্রিম কোর্ট আবেদনকারীদের পক্ষে শ্রেষ্ঠি অগ্নিহোত্রিকে নোডাল কাউন্সেল হিসেবে নিয়োগ করেছে। অন্যদিকে, রাজ্যগুলির পক্ষ থেকে যোগাযোগ ও নথির সমন্বয় করবেন আইনজীবী রুচিরা গোয়েল। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, রাজ্যগুলির মতামত শুনে তারপরই আইনের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আইনের ইতিহাস
ধর্মান্তকরণ বিরোধী আইন নিয়ে মামলা সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে রয়েছে বহুদিন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি.ওয়াই. চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ প্রথম নোটিস জারি করেছিল। পরে জামিয়ত উলেমা-ই-হিন্দ ছয়টি হাইকোর্টে চলমান ২১টি পৃথক মামলার শুনানি একত্রে সুপ্রিম কোর্টে স্থানান্তরের আবেদন জানায়। উদ্দেশ্য ছিল, সর্বোচ্চ আদালত যেন একযোগে এবং অভিন্ন রায় দিতে পারে।
সংবিধান বনাম আইন
আবেদনকারীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, ধর্মান্তকরণ বিরোধী আইনগুলি সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, মর্যাদা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মতো মৌলিক অধিকারকে আঘাত করছে। যদিও আইনের শিরোনামে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা’ উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকারের পূর্ববর্তী বক্তব্য ছিল, প্রতিটি রাজ্যের আইন পরীক্ষা করার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের। কিন্তু আবেদনকারীরা বলেন, এখানে সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে, যা সমাধান করতে পারে কেবল সুপ্রিম কোর্ট।
রাজ্যগুলির যুক্তি
রাজ্য সরকারগুলির দাবি, এই আইন দরকার দুর্বল শ্রেণির মানুষদের রক্ষা করতে। বিশেষ করে নারী, আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক সম্প্রদায় প্রতারণা বা জোরজবরদস্তির শিকার হতে পারেন। তাঁরা যুক্তি দেন, এই আইন না থাকলে ধর্মান্তরণে প্রতারণার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।
সমালোচনা ও বাস্তবতা
সমালোচকরা বলেন, আন্তঃধর্মীয় বিবাহকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা সংবিধানবিরোধী। আইনটির মাধ্যমে প্রমাণের ভার অভিযুক্তের ওপর চাপানো হচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থী। বাস্তবে এটি গোষ্ঠী-ভিত্তিক নজরদারি এবং স্বঘোষিত ধর্মরক্ষকদের কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে তুলছে। বহু ক্ষেত্রে পুলিশি হয়রানি, গ্রেফতার এবং সামাজিক বয়কটের মতো ঘটনা ঘটছে।
ধর্মান্তরণ ও রাজনীতি
ধর্মান্তরণ নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিকও বটে। ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিভাজন তৈরির চেষ্টা এবং সামাজিক উত্তেজনা বাড়ানোর উপায় হিসেবে এই আইন ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক রাজ্য দাবি করছে, দুর্বলদের রক্ষায় এই আইন প্রয়োজন। ফলে এটি ভারতের সংবিধানের মৌলিক চেতনাকে পরীক্ষা করছে।
পরবর্তী শুনানির দিকে নজর
ছয় সপ্তাহ পরে পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ততদিনে নয়টি রাজ্য তাদের মতামত আদালতে জমা দেবে। আদালত শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত নেবে আইনের বৈধতা নিয়ে। নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক মহল এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই মামলার দিকে তাকিয়ে আছে। এটি ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত অধিকার এবং আইন প্রয়োগের ভারসাম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।






















