ডিজিটাল ব্যুরো | Y বাংলা নিউজ
বৃহস্পতিবারের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা নিঃসন্দেহে আই-প্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি-র অভিযান। সেই তল্লাশি চলাকালীনই নাটকীয়ভাবে প্রতীকের ফ্ল্যাটে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছুক্ষণ পর বুকে আগলে একটি সবুজ ফোল্ডার হাতে বেরিয়ে আসেন তিনি। পরে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আই-প্যাকের অফিসেও যান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেও তাঁর গাড়িতে এক সহযোগীকে কয়েকটি ফাইল তুলতে দেখা যায়।
দিনভর এই ঘটনাপ্রবাহের পর সাধারণ মানুষের মনে মূলত দু’টি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
এক, মুখ্যমন্ত্রীর হাতে থাকা ওই সবুজ ফাইলে আসলে কী ছিল?
দুই, ইডি-র তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী কি এভাবে ঢুকে পড়ে ফাইল নিয়ে আসতে পারেন?
দ্বিতীয় প্রশ্নটি নতুন নয়। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই তল্লাশির সময়েও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী। সিবিআই ও কলকাতা পুলিশের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ ওঠে। তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সিবিআই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেও, শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বড় কোনও আইনি পরিণতিতে গড়ায়নি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এবারও মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও, এই প্রশ্ন আদতে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছবে না। বিরোধীরা যেমন সমালোচনায় সরব, তেমনই শাসক শিবির এই ঘটনাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলেই দেখছে।
এবার আসা যাক সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নে—সবুজ ফাইলে কী ছিল?
মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রতীক জৈনের বাড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা ছিল। তাঁর দাবি, বিজেপি ইডি-কে ব্যবহার করে সেই তালিকা হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল। সেই কারণেই তিনি ওই নথি সেখান থেকে সরিয়ে এনেছেন। মমতার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সবুজ ফোল্ডারের মধ্যেই ছিল তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।
এই একটি বক্তব্যই মুহূর্তের মধ্যে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বদলে দিয়েছে। সবুজ ফোল্ডার বুকে আগলে বেরিয়ে আসার সেই ছবি কার্যত দিনের সবচেয়ে আলোচিত ফ্রেম হয়ে উঠেছে।
বাস্তবে ওই ফাইলে কী ছিল, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। হতে পারে তাতে কেবল সাদা কাগজই ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় তৃণমূলের কোর সমর্থক, দলের কর্মী ও বিজেপি-বিরোধী একাংশের কাছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
আই-প্যাক তৃণমূলের সংগঠনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, তা অজানা নয়। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের পর প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বে আই-প্যাক বাংলায় সক্রিয় হয়। বর্তমানে বুথ স্তর থেকে শুরু করে সংগঠনের ডেটা, সমীক্ষা, প্রার্থী বাছাইয়ের খসড়া, প্রচারের নকশা—সবই পেশাদারভাবে আই-প্যাকের কাছে থাকা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সেই অর্থে প্রতীক জৈনের বাড়ি বা আই-প্যাকের অফিসে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে?
তৃণমূল বিরোধীদের একাংশ এই ঘটনায় স্বস্তি পেলেও, শাসক দলের ভিতরের যে অংশ আই-প্যাকের প্রভাব নিয়ে অসন্তুষ্ট, তাঁদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক চিত্রে এই ঘটনা পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থানকে আরও তীক্ষ্ণ করবে বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
সংবিধানের ৩৫৫ বা ৩৫৬ ধারা প্রয়োগের প্রশ্নও উঠেছে। বিজেপি এই ঘটনাকে সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। তবে অতীতে অরুণাচল ও উত্তরাখণ্ডে রাষ্ট্রপতি শাসন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় মাথায় রেখে কেন্দ্র সেই পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তবে এটুকু স্পষ্ট, এই ঘটনা এখানেই শেষ হচ্ছে না। সূত্রের খবর, প্রতীক জৈনকে ইডি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস দিতে পারে। অতীতে যেমন রাজীব কুমারকে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তেমন পরিস্থিতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, আই-প্যাক ইডি অভিযান, সবুজ ফাইল এবং মুখ্যমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ—এই ত্রয়ী আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতির উত্তাপ আরও বাড়াবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।









0 comments:
Post a Comment
আপনার মতামত এর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ 👇
👉 যদি মনে হয় বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, পোস্টটি শেয়ার করুন 🔄নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন