রাষ্ট্রপুঞ্জে প্যালেস্তাইনের পক্ষে ভারতের ঐতিহাসিক সমর্থন: দ্বিরাষ্ট্র নীতির পক্ষে ভোট
আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ছবি: রাষ্ট্রপুঞ্জের ভোটাভুটিতে ভারতের প্রতিনিধি প্যালেস্তাইনের পক্ষে ভোট দেন।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটিতে ভারত ঐতিহাসিক সমর্থন জানালো। দীর্ঘদিন ধরে প্যালেস্তাইন প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থান বা মাঝে মাঝে ভোটদান থেকে বিরত থাকার কারণে মোদি সরকারের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে এবার ভারত স্পষ্টভাবে দ্বিরাষ্ট্র নীতির পক্ষে ভোট দিয়েছে—যেখানে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন দুটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রস্তাবে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
নতুন ঘোষণা: ‘New York Declaration’
রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার আগে ‘New York Declaration’ নামে একটি ঘোষণাপত্র পেশ করা হয়। এতে প্যালেস্তাইনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের দ্বিরাষ্ট্র নীতির রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে:
- গাজা প্যালেস্তাইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিলিত হবে।
- প্যালেস্তিনীয় ভূখণ্ড জবরদখল, অবরোধ এবং উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে।
- নিরীহ নাগরিকদের ওপর হিংসা ও অত্যাচার বন্ধ করতে হবে।
- ইজরায়েলি নেতৃত্বকে দ্বিরাষ্ট্র নীতি কার্যকর করতে এগিয়ে আসতে হবে।
এই ঘোষণাপত্রে প্যালেস্তিনীয় জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার নিন্দা করা হলেও, হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক বিতর্কও।
ভারতের অবস্থান কেন তাৎপর্যপূর্ণ?
ভারত প্যালেস্তাইনের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিক সমর্থন দিয়ে এসেছে। আরব দুনিয়ার পর ভারতই প্রথম দেশ, যারা প্যালেস্তিনীয়দের প্রতিনিধি হিসেবে Palestine Liberation Organisation-কে স্বীকৃতি দেয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভোটের সময় ভারত চারবার ভোটদান থেকে বিরত ছিল। অনেকেই বলছিলেন, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে।
এই পটভূমির মধ্যে দ্বিরাষ্ট্র নীতির পক্ষে ভারতের সমর্থন আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠালো। ভারত আবারও প্যালেস্তাইনের পাশে দাঁড়ালো। ১৪২টি দেশ এই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছে। বিপরীতে ১০টি দেশ বিরোধিতা করেছে, আর ১২টি দেশ ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে।
কারা বিরোধিতা করেছে?
প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে ইজরায়েল, আমেরিকা, আর্জেন্টিনা, হাঙ্গেরি, মাইক্রোনেশিয়া, পালাউ, পাপুয়া নিউ গিনি, প্যারাগুয়ে, টঙ্গা সহ আরও কয়েকটি দেশ। তাদের যুক্তি, ঘোষণাপত্র বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে এবং এতে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। ইজরায়েলের বক্তব্য:
“রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভা আবারও রাজনৈতিক সার্কাসে পরিণত হয়েছে। বাস্তব সমস্যার সমাধান নেই, শুধু শর্তের তালিকা দেওয়া হয়েছে।”
আমেরিকার কূটনীতিক মর্গ্যান ওর্টাগাস বলেন:
“ভুল হচ্ছে। এই ঘোষণাপত্র হামাসের জন্য উপহার।”
গাজায় যুদ্ধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১২০০ ইজরায়েলি নাগরিক নিহত হন এবং ২৫০ জন পণবন্দি হন। এরপর থেকেই গাজায় ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। ইজরায়েলের বিমান হামলা, স্থল আক্রমণ এবং অবরোধে হাজার হাজার নিরীহ প্যালেস্তিনীয় নিহত হয়েছেন। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—সবাই আক্রান্ত। খাদ্য, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে এই যুদ্ধ, অবরোধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। পাশাপাশি ইজরায়েলি নেতৃত্বকে দ্বিরাষ্ট্র নীতির বাস্তবায়নের জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে হিংসা বন্ধ, ভূখণ্ড দখল বন্ধ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিশ্বের বহু দেশ ভারতের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে। আরব রাষ্ট্রগুলো একযোগে দ্বিরাষ্ট্র নীতির পক্ষে ভোট দিয়েছে। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ার বহু দেশও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। যদিও পশ্চিমা কিছু দেশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে, তবুও আন্তর্জাতিক মহলে এই ভোট মানবিক সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্য
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একইসঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান ভোটে ভারতের অবস্থান কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার দৃষ্টান্ত। ভারত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—শান্তি ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য দ্বিরাষ্ট্র নীতিকে সমর্থন করা প্রয়োজন।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
দ্বিরাষ্ট্র নীতির বাস্তবায়ন সহজ হবে না। ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের মধ্যে শতবর্ষের সংঘাত, ভূখণ্ড দখল, সামরিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক বিভক্তি রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সমর্থন ভবিষ্যৎ আলোচনায় নতুন পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ভোট মানবাধিকার ও শান্তির পক্ষে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াবে।
উপসংহার
রাষ্ট্রপুঞ্জে প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের পক্ষে ভারতের ঐতিহাসিক ভোট শুধু কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়, এটি মানবিকতা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে এক শক্তিশালী বার্তা। যুদ্ধ, সংঘাত, অবরোধ ও দখলের বিপরীতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান আন্তর্জাতিক আলোচনাকে নতুন দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
📢 সবার আগে নিউজ আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন
📰 রাজনীতি | ⚽ খেলা | 🎬 বিনোদন | 🌍 আন্তর্জাতিক খবর
👉 সবকিছু এক ক্লিকেই পান আপনার হাতে।









0 comments:
Post a Comment
আপনার মতামত এর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ 👇
👉 যদি মনে হয় বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, পোস্টটি শেয়ার করুন 🔄নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন